একাধিক ব্রাঞ্চের মোবাইল রিপেয়ার শপ পরিচালনার গাইড

৭ মিনিটে পড়ুন

দ্বিতীয় দোকান খোলার আগে ও পরে কী ঠিক করবেন: ম্যানেজার বাছাই, একই দাম ও নিয়ম, ব্রাঞ্চভিত্তিক হিসাব, স্টক আর দূর থেকে সব ব্রাঞ্চ নজরে রাখার উপায়।

একটা দোকান ভালো চললে স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে, "আরেকটা ব্রাঞ্চ খুলি।" হয়তো পাশের বাজারে, হয়তো অন্য থানায়, বা জেলা শহরে। কিন্তু অনেক মালিক দ্বিতীয় দোকান খোলার পর দেখেন, প্রথম দোকানের লাভও কমে গেছে। কারণ মালিক একসাথে দুই জায়গায় থাকতে পারেন না, আর যে নিয়মগুলো এতদিন তাঁর মাথায় ছিল, সেগুলো নতুন দোকানে কেউ জানে না।

এই লেখায় দেখাব, একাধিক ব্রাঞ্চ খোলার আগে কী প্রস্তুতি নেবেন, প্রতিটা ব্রাঞ্চে কী একই রাখবেন, আর দূর থেকে কীভাবে সব ব্রাঞ্চের হিসাব নজরে রাখবেন।

দ্বিতীয় ব্রাঞ্চ খোলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন

উত্তেজনায় দোকান খোলার আগে এই প্রশ্নগুলোর সৎ উত্তর দিন:

  1. প্রথম দোকান কি আপনাকে ছাড়া এক সপ্তাহ চলতে পারে? না পারলে আগে সেই ব্যবস্থা করুন। নতুন ব্রাঞ্চে আপনার অনেক সময় যাবে।
  2. আপনার কাছে কি বিশ্বস্ত কেউ আছে যাকে ম্যানেজার করা যায়? ভালো টেকনিশিয়ান মানেই ভালো ম্যানেজার নয়।
  3. প্রথম দোকানের আসল লাভ কি আপনি জানেন? না জানলে বুঝবেন না নতুন ব্রাঞ্চ লাভে চলছে কি না। দৈনিক লাভের হিসাব নিয়ে পড়ুন দোকানের দৈনিক লাভ-ক্ষতির হিসাব।
  4. নতুন দোকানের ৬ মাসের ভাড়া, বেতন আর স্টকের টাকা কি হাতে আছে? নতুন ব্রাঞ্চে কাস্টমার আসতে সময় লাগে, প্রথম কয়েক মাস লোকসান হওয়াই স্বাভাবিক।

উদাহরণ: নতুন দোকানের ভাড়া মাসে ১২,০০০, দুইজন স্টাফ মিলে ২২,০০০, বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট ৩,০০০, মোট মাসে ৩৭,০০০ টাকা। ছয় মাসে ২,২২,০০০ টাকা, এর সাথে অগ্রিম ভাড়া, ডেকোরেশন আর শুরুর পার্টস স্টক। এই টাকা প্রথম দোকানের ক্যাশ থেকে টানলে দুটো দোকানই বিপদে পড়তে পারে।

সঠিক ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বাছাই

নতুন ব্রাঞ্চের সাফল্যের অর্ধেক নির্ভর করে ম্যানেজারের ওপর। খেয়াল করুন:

  • হিসাবে সৎ আর গোছানো কি না। প্রথম দোকানে কয়েক মাস ক্যাশ সামলাতে দিয়ে দেখুন গরমিল হয় কি না।
  • কাস্টমারের সাথে ঠান্ডা মাথায় কথা বলতে পারে কি না। অভিযোগ সামলানো ম্যানেজারের বড় কাজ।
  • নিয়ম মানে আর মানাতে পারে কি না। নিজে এন্ট্রি না দিলে স্টাফরাও দেবে না।

ম্যানেজারকে দায়িত্ব দেওয়ার সাথে সাথে প্রণোদনাও দিন। যেমন বেতনের সাথে ব্রাঞ্চের মাসিক লাভের একটা ছোট শতাংশ। তাহলে ব্রাঞ্চের লাভ তার নিজের স্বার্থ হয়ে যায়।

সব ব্রাঞ্চে যা একই রাখবেন

কাস্টমার যেন যে কোনো ব্রাঞ্চে গিয়ে একই অভিজ্ঞতা পান, এজন্য কিছু জিনিস লিখিতভাবে ঠিক করে দিন:

দামের তালিকা

ডিসপ্লে বদল, ব্যাটারি বদল, চার্জিং পোর্ট, সফটওয়্যারের কাজ, প্রতিটার দাম বা দামের সীমা লিখে দিন। এক ব্রাঞ্চে ২,৮০০ আর আরেক ব্রাঞ্চে ৩,৫০০ টাকা নিলে কাস্টমার দুই জায়গার কথা মেলালে আস্থা হারাবেন। কোন ব্রাঞ্চ কত পর্যন্ত ছাড় দিতে পারবে, সেটাও ঠিক করুন। দাম ঠিক করার পদ্ধতি নিয়ে পড়ুন রিপেয়ারের দাম কীভাবে ঠিক করবেন।

ফোন রিসিভের নিয়ম

ফোন জমা নেওয়ার সময় কন্ডিশন, IMEI, লক, সঙ্গে আসা এক্সেসরিজ, সব একই নিয়মে লেখা হবে। আমাদের ফোন রিসিভ করার চেকলিস্ট প্রিন্ট করে প্রতিটা ব্রাঞ্চের কাউন্টারে লাগিয়ে দিতে পারেন।

ওয়ারেন্টির নিয়ম

এক ব্রাঞ্চে করা কাজের ওয়ারেন্টি অন্য ব্রাঞ্চে দাবি করা যাবে কি না, আগে ঠিক করুন। কাস্টমারের কাছে সব ব্রাঞ্চ একই দোকান, তাই পারলে যে কোনো ব্রাঞ্চে ওয়ারেন্টি দিন। এজন্য অবশ্য সব ব্রাঞ্চের কাজের রেকর্ড এক জায়গায় থাকতে হবে।

রশিদ আর জব নম্বর

প্রতিটা কাজের রশিদে দোকানের নাম, ব্রাঞ্চের ঠিকানা আর ফোন নম্বর থাকবে। জব নম্বর দেখলেই যেন বোঝা যায় কোন ব্রাঞ্চের কাজ।

ব্রাঞ্চভিত্তিক হিসাব আলাদা রাখুন

সবচেয়ে বড় ভুল হলো সব ব্রাঞ্চের টাকা এক বাক্সে মিশিয়ে ফেলা। তখন বোঝা যায় না কোন ব্রাঞ্চ লাভ দিচ্ছে আর কোনটা অন্যটার লাভ খেয়ে ফেলছে।

প্রতিটা ব্রাঞ্চের জন্য আলাদা করে দেখুন:

  • দৈনিক আর মাসিক আয়
  • পার্টস ও বিক্রি করা মালের কেনা দাম
  • ভাড়া, বেতন, বিল সহ সব খরচ
  • বাকি কত, আর কতদিনের পুরনো
  • কতগুলো ফোন এল, কতগুলো ডেলিভারি হলো, কতগুলো আটকে আছে

এক ব্রাঞ্চ থেকে আরেক ব্রাঞ্চে পার্টস পাঠালে সেটাও লিখে রাখুন। না হলে এক ব্রাঞ্চের স্টক কম আর আরেকটার বেশি দেখাবে, আর লাভের হিসাব ভুল হবে। স্টক নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন মোবাইল পার্টসের স্টক ম্যানেজমেন্ট লেখায়।

দূর থেকে নজর রাখার উপায়

দুই-তিনটা ব্রাঞ্চ হলে প্রতিদিন সব দোকানে গিয়ে খাতা দেখা সম্ভব নয়। তাই একটা রুটিন বানান:

  1. প্রতিদিন রাতে: প্রতিটা ব্রাঞ্চের আজকের আয়, খরচ আর ক্যাশ দেখুন। কোনো ব্রাঞ্চে হঠাৎ আয় অনেক কম হলে পরদিন সকালেই ম্যানেজারকে ফোন করুন।
  2. সপ্তাহে একবার: কতগুলো ফোন তিন দিনের বেশি পড়ে আছে, দেখুন। আটকে থাকা কাজ মানে অসন্তুষ্ট কাস্টমার।
  3. মাসে একবার: প্রতিটা ব্রাঞ্চে না জানিয়ে গিয়ে স্টক গুনুন, আর হিসাবের সাথে মেলান।
  4. মাসে একবার: সব ম্যানেজারকে নিয়ে বসুন। কোন ব্রাঞ্চ কী ভালো করছে, অন্যরা কী শিখতে পারে, আলোচনা করুন।

এই রুটিন খাতায় চালানো কঠিন, কারণ খাতা থাকে ব্রাঞ্চে আর আপনি থাকেন অন্য জায়গায়। RepairKhata-র Business প্ল্যানে একাধিক ব্রাঞ্চ যোগ করা যায়, আর মালিক সব ব্রাঞ্চের হিসাব একসাথে দেখতে পারেন। দোকানের বাইরে থেকেও ফোনের ব্রাউজার বা Android অ্যাপ দিয়ে দেখা যায়। প্ল্যানগুলোর বিস্তারিত পাবেন প্রাইসিং পেজে।

স্টাফের দায়িত্ব আর অনুমতি ঠিক করুন

একাধিক ব্রাঞ্চে সব স্টাফকে সব কিছু দেখতে বা বদলাতে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। একটা সাধারণ ভাগ:

  • মালিক: সব ব্রাঞ্চের সব হিসাব।
  • ম্যানেজার: নিজের ব্রাঞ্চের কাজ, খরচ, স্টক আর রিপোর্ট।
  • টেকনিশিয়ান: তাকে দেওয়া রিপেয়ার কাজ আর ব্যবহৃত পার্টস।
  • ফ্রন্ট ডেস্ক: ফোন রিসিভ, কাস্টমারের তথ্য, ডেলিভারি।
  • ক্যাশিয়ার: পেমেন্ট নেওয়া আর রশিদ দেওয়া।

RepairKhata-তে মালিক, ম্যানেজার, টেকনিশিয়ান, ফ্রন্ট ডেস্ক আর ক্যাশিয়ার, প্রতিটা রোলের অ্যাক্সেস আলাদা, আর কোন টেকনিশিয়ান কতগুলো কাজ শেষ করলেন তাও দেখা যায়। রোল দিয়ে গরমিল ঠেকানো নিয়ে পড়ুন স্টাফ রোল দিয়ে হিসাবের গরমিল ও চুরি রোধ।

যেসব ভুল এড়াবেন

  • খুব তাড়াতাড়ি তৃতীয় ব্রাঞ্চ খোলা। দ্বিতীয়টা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগে আরেকটা খুলবেন না।
  • সেরা টেকনিশিয়ানকে নতুন ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে পুরনোটা দুর্বল করা। দুই দোকানেই অভিজ্ঞ আর নতুন লোক মিশিয়ে রাখুন।
  • সব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া। ম্যানেজারকে ছোট সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা দিন, নইলে প্রতিটা কাস্টমারের জন্য আপনাকে ফোন করবে।
  • কাগজে নিয়ম না লেখা। "আমি তো বলেছিলাম", এটা নিয়ম নয়। লিখিত নিয়মই সব ব্রাঞ্চে একই থাকে।

শেষ কথা

একাধিক ব্রাঞ্চ মানে শুধু বেশি দোকান নয়, বেশি নিয়ম আর বেশি নজরদারি। একই দাম, একই রিসিভের নিয়ম, ব্রাঞ্চভিত্তিক আলাদা হিসাব আর প্রতিদিনের ছোট একটা রুটিন, এগুলো ঠিক থাকলে দূর থেকেও ব্যবসা হাতের মুঠোয় থাকে।

ব্রাঞ্চ, স্টাফ রোল আর রিপোর্ট সফটওয়্যারে কেমন দেখায়, তা কোনো অ্যাকাউন্ট ছাড়াই লাইভ ডেমোতে দেখে নিন। নিজের দোকান দিয়ে শুরু করতে চাইলে ৭ দিনের ফ্রি ট্রায়াল নিন।

সব লেখা