মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের দৈনিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করার নিয়ম
৭ মিনিটে পড়ুন
ক্যাশ বাক্সের টাকা মানেই লাভ নয়। টাকার উদাহরণ দিয়ে শিখুন রিপেয়ার দোকানের দৈনিক আয়, পার্টসের খরচ, দোকানের খরচ আর আসল লাভ কীভাবে ১০ মিনিটে হিসাব করবেন।
দিনের শেষে ক্যাশ বাক্সে ১৪ হাজার টাকা দেখে মনে হয়, "আজ ভালো দিন গেল।" কিন্তু এর মধ্যে কত টাকা পার্টসের দাম, কত টাকা পুরনো বাকি থেকে আসা, আর দোকান ভাড়া বা স্টাফের বেতনের ভাগ কত, সেটা বাদ দিলে আসল লাভ অনেক কম হতে পারে। অনেক দোকান বছরের পর বছর চলে, অথচ মালিক জানেন না কোন দিন লাভ হলো আর কোন দিন আসলে লোকসান।
এই লেখায় একটা সাধারণ মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের উদাহরণ দিয়ে দেখাব, দৈনিক লাভ-ক্ষতি কীভাবে হিসাব করবেন, আর ক্যাশ কীভাবে মেলাবেন। পুরো কাজটা দিনে ১০ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।
ক্যাশ আর লাভ এক জিনিস নয়
প্রথমেই এই পার্থক্যটা পরিষ্কার করা দরকার:
- ক্যাশ হলো আজ হাতে বা বিকাশ-নগদে কত টাকা এল আর কত গেল।
- লাভ হলো আজ যে কাজ আর বিক্রি হলো, তার দাম থেকে সেই কাজের খরচ বাদ দিয়ে কত থাকল।
দুটো আলাদা হয় কয়েকটা কারণে। কেউ আজ কাজ করিয়ে টাকা বাকি রাখলেন, তাহলে লাভ হলো কিন্তু ক্যাশ এল না। আবার কেউ গত মাসের বাকি আজ দিলেন, তাহলে ক্যাশ এল কিন্তু সেটা আজকের লাভ নয়। আজ বাজার থেকে ১০টা ব্যাটারি কিনলেন, ক্যাশ গেল, কিন্তু সেটা আজকের খরচ নয়, কারণ ব্যাটারিগুলো এখনো তাকে আছে।
তাই দুটো হিসাব আলাদা রাখুন: একটা লাভের, একটা ক্যাশ মেলানোর।
লাভ হিসাবের সহজ সূত্র
দৈনিক লাভ বের করার সূত্র:
আসল লাভ = (রিপেয়ার বিল + বিক্রি) − (ব্যবহৃত পার্টস ও বিক্রি করা মালের কেনা দাম) − আজকের খরচ − নির্দিষ্ট খরচের দৈনিক ভাগ
চারটা অংশ আলাদা করে বুঝি।
১. আজকের আয়
আজ যতগুলো রিপেয়ার ডেলিভারি দিলেন, সেগুলোর মোট বিল (ছাড় বাদ দিয়ে), আর এক্সেসরিজ যা বিক্রি করলেন তার মোট দাম। কাস্টমার পুরো টাকা দিয়েছেন কি না, সেটা এখানে দেখার বিষয় নয়।
২. সরাসরি খরচ
যে কাজ আর বিক্রি থেকে আয় হলো, তার জন্য সরাসরি যা খরচ হয়েছে: কাজে লাগানো ডিসপ্লে, ব্যাটারি, চার্জিং পোর্টের কেনা দাম, আর বিক্রি করা চার্জার, কভার, হেডফোনের কেনা দাম।
৩. আজকের দোকান খরচ
চা-নাস্তা, পার্টস আনতে রিকশা ভাড়া, সোল্ডারিং সামগ্রী, ছোটখাটো কেনাকাটা।
৪. নির্দিষ্ট খরচের দৈনিক ভাগ
দোকান ভাড়া, স্টাফের বেতন, বিদ্যুৎ আর ইন্টারনেট বিল প্রতিদিন দিতে হয় না, কিন্তু প্রতিদিনই এগুলোর ভাগ আছে। মাসিক মোট খরচকে ৩০ দিয়ে ভাগ করুন।
একটা পুরো দিনের উদাহরণ
ধরি ঢাকার একটা মাঝারি দোকান, দুইজন টেকনিশিয়ান। আজকের হিসাব:
আয়:
- ১২টা রিপেয়ার ডেলিভারি, মোট বিল ১০,৮০০ টাকা (এর মধ্যে একজন ১,৫০০ টাকা বাকি রেখেছেন)।
- এক্সেসরিজ বিক্রি ৩,৫০০ টাকা।
- মোট আয়: ১৪,৩০০ টাকা।
সরাসরি খরচ:
- ১২টা কাজে লাগানো পার্টসের কেনা দাম ৪,২০০ টাকা।
- বিক্রি করা এক্সেসরিজের কেনা দাম ২,৩০০ টাকা।
- মোট: ৬,৫০০ টাকা।
আজকের দোকান খরচ: চা-নাস্তা ১৫০, রিকশা ভাড়া ১০০, মোট ২৫০ টাকা।
নির্দিষ্ট খরচের দৈনিক ভাগ:
- দোকান ভাড়া মাসে ১৫,০০০, দিনে ৫০০ টাকা।
- দুইজন স্টাফের বেতন মাসে ২৪,০০০, দিনে ৮০০ টাকা।
- বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট মাসে ৩,০০০, দিনে ১০০ টাকা।
- মোট: ১,৪০০ টাকা।
আসল লাভ: ১৪,৩০০ − ৬,৫০০ − ২৫০ − ১,৪০০ = ৬,১৫০ টাকা।
খেয়াল করুন, এখানে মালিকের নিজের পারিশ্রমিক ধরা হয়নি। মালিক নিজে দোকানে বসলে নিজের জন্যও একটা মাসিক বেতন ধরে নির্দিষ্ট খরচে যোগ করুন, তাহলে বুঝবেন দোকান আসলে আপনার শ্রমের বাইরে কত লাভ দিচ্ছে।
দিনের শেষে ক্যাশ মেলানো
লাভের হিসাবের পাশাপাশি দেখতে হবে ক্যাশ বাক্সে যত টাকা থাকার কথা, ততই আছে কি না। একই দিনের উদাহরণে, ধরি সব লেনদেন নগদে হয়েছে:
- সকালে বাক্সে ছিল (ওপেনিং ক্যাশ): ২,০০০ টাকা।
- রিপেয়ার থেকে নগদ এল: ১০,৮০০ − ১,৫০০ বাকি = ৯,৩০০ টাকা।
- পুরনো এক কাস্টমার বাকি শোধ করলেন: ১,০০০ টাকা।
- এক্সেসরিজ বিক্রি: ৩,৫০০ টাকা।
- খরচ গেল: ২৫০ টাকা।
- বাজার থেকে নতুন পার্টস কিনলেন: ১,৫০০ টাকা।
বাক্সে থাকার কথা: ২,০০০ + ৯,৩০০ + ১,০০০ + ৩,৫০০ − ২৫০ − ১,৫০০ = ১৪,০৫০ টাকা।
গুনে যদি ১৩,৫৫০ পান, তাহলে ৫০০ টাকার গরমিল। আজই খুঁজুন: কোনো খরচ লেখা হয়নি, কোনো বিক্রি ভুল লেখা হয়েছে, নাকি কেউ টাকা নিয়েছে। কালকে খুঁজলে আর মনে থাকবে না।
বিকাশ, নগদ বা রকেটে যে টাকা আসে তা বাক্সে থাকে না। তাই ক্যাশ আর মোবাইল ব্যাংকিং আলাদা কলামে লিখুন, আর দিনের শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যালান্সও মিলিয়ে নিন।
গরমিল বারবার হলে স্টাফ অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করা দরকার। পড়ুন স্টাফ রোল দিয়ে হিসাবের গরমিল ও চুরি রোধ।
যেসব ভুলে হিসাব গোলমাল হয়
- পার্টস কেনাকে আজকের খরচ ধরা। ১০টা ব্যাটারি কিনলে সেটা স্টক, খরচ নয়। যেদিন ব্যাটারিটা কাজে লাগবে, সেদিন তার কেনা দাম খরচ হবে।
- বাকি আদায়কে আজকের আয় ধরা। এতে আজকের লাভ বেশি দেখায়, আর যেদিন কাজ হয়েছিল সেদিনেরটা কম দেখায়।
- ছোট খরচ না লেখা। দিনে ২০০ টাকার না-লেখা খরচ মাসে ৬,০০০ টাকার গরমিল তৈরি করে।
- ওয়ারেন্টিতে ফেরত আসা কাজের খরচ ভুলে যাওয়া। ওয়ারেন্টিতে ডিসপ্লে আবার বদলালে কাস্টমার টাকা দেন না, কিন্তু নতুন ডিসপ্লের দাম আপনার খরচ।
- মালিকের পকেট আর দোকানের ক্যাশ মিশিয়ে ফেলা। বাক্স থেকে বাজার করতে নিলে সেটাও লিখে রাখুন।
সাপ্তাহিক আর মাসিক চোখ বুলানো
প্রতিদিনের লাভ ওঠানামা করবেই। শুক্রবার হয়তো ভিড় বেশি, বৃষ্টির দিন কম। তাই সপ্তাহে একবার সাত দিনের লাভ যোগ করে দেখুন, আর মাসে একবার এই প্রশ্নগুলো করুন:
- কোন ধরনের রিপেয়ারে লাভ সবচেয়ে বেশি, কোনটায় প্রায় নেই?
- এক্সেসরিজ বিক্রি থেকে মাসে আসলে কত লাভ হচ্ছে?
- কোন খরচ গত মাসের চেয়ে বেড়েছে?
- কত টাকা বাকি পড়ে আছে, আর কতদিন ধরে?
লাভ কম হলে দাম ঠিক আছে কি না দেখুন। সে বিষয়ে বিস্তারিত আছে রিপেয়ারের দাম কীভাবে ঠিক করবেন লেখায়।
খাতায় না সফটওয়্যারে
উপরের হিসাব খাতায় করা যায়, কিন্তু প্রতিটা কাজে কোন পার্টস লাগল আর তার কেনা দাম কত, সেটা খাতায় আলাদা করে খোঁজা ঝামেলার। RepairKhata-তে কাজে ব্যবহৃত পার্টস, এক্সেসরিজ বিক্রি, খরচ আর বাকি আলাদা আলাদা লেখা থাকে, তাই দৈনিক আয়, লাভ আর রিপোর্ট ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়। মালিক দোকানের বাইরে থেকেও আজকের অবস্থা দেখে নিতে পারেন। খাতা আর সফটওয়্যারের তুলনা নিয়ে পড়ুন খাতা বনাম সফটওয়্যার।
শেষ কথা
আজ থেকেই শুরু করুন: দিনের শেষে দশ মিনিট সময় নিয়ে আয়, সরাসরি খরচ, দোকান খরচ আর নির্দিষ্ট খরচের ভাগ লিখুন, তারপর ক্যাশ মেলান। এক মাস করলে বুঝবেন দোকান আসলে কত দিচ্ছে, আর কোথায় টাকা হারাচ্ছে।
এই হিসাব সফটওয়্যারে কেমন দেখায়, তা কোনো অ্যাকাউন্ট ছাড়াই লাইভ ডেমোতে দেখতে পারেন। নিজের দোকানে চালাতে চাইলে ৭ দিনের ফ্রি ট্রায়াল দিয়ে শুরু করুন।
আরও পড়ুন
- মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের হিসাব রাখার সহজ উপায়দিন শেষে ক্যাশ মেলে না? মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের জব, পার্টস, বাকি আর খরচের হিসাব কীভাবে প্রতিদিন ১০ মিনিটে গুছিয়ে রাখবেন, ধাপে ধাপে দেখুন।
- খাতা বনাম সফটওয়্যার: রিপেয়ার শপের হিসাবে কোনটা ভালো?কাগজের খাতা না রিপেয়ার শপ সফটওয়্যার? খরচ, ঝুঁকি, সময় আর বাকি আদায়ের দিক থেকে দুটোর সৎ তুলনা, আর খাতা থেকে সফটওয়্যারে যাওয়ার সহজ ধাপ জেনে নিন।
- স্টাফ রোল দিয়ে দোকানের হিসাবের গরমিল ও চুরি রোধের উপায়দিন শেষে ড্রয়ারের টাকা মেলে না? পার্টস কম পড়ে? কাকে কী দায়িত্ব আর কী অ্যাক্সেস দেবেন, কীভাবে হিসাব মেলাবেন, আর বিশ্বাস রেখেও কীভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখবেন জানুন।