মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের হিসাব রাখার সহজ উপায়

৭ মিনিটে পড়ুন

দিন শেষে ক্যাশ মেলে না? মোবাইল সার্ভিসিং দোকানের জব, পার্টস, বাকি আর খরচের হিসাব কীভাবে প্রতিদিন ১০ মিনিটে গুছিয়ে রাখবেন, ধাপে ধাপে দেখুন।

মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে সারাদিন কাজের চাপ থাকে। কেউ ডিসপ্লে বদলাতে এসেছে, কেউ চার্জিং পোর্ট, কেউ শুধু জানতে এসেছে তার ফোন রেডি হয়েছে কিনা। এর মধ্যে কাউন্টারে এক্সেসরিজ বিক্রি, সাপ্লায়ারকে পার্টসের টাকা দেওয়া, চা-নাস্তার খরচ। রাতে দোকান বন্ধ করার সময় ক্যাশ গুনে দেখা যায় হিসাব মেলে না, আর কোথায় ভুল হলো সেটা কেউ মনে করতে পারে না।

ভালো খবর হলো, হিসাব রাখা কঠিন কিছু না। দরকার একটা নির্দিষ্ট নিয়ম, যেটা দোকানের সবাই মেনে চলবে। এই লেখায় আমরা দেখব একটা সার্ভিসিং দোকানের হিসাব কোন কোন ভাগে রাখতে হয়, প্রতিদিন কী কী লিখতে হয়, আর কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি টাকা খেয়ে ফেলে।

সার্ভিসিং দোকানের টাকা আসে-যায় কোথা দিয়ে

আগে বুঝে নিন আপনার দোকানে টাকা কোন কোন পথে ঢোকে আর বের হয়। প্রতিটা পথের আলাদা হিসাব না থাকলে সব একসাথে গুলিয়ে যায়।

টাকা আসে

  • রিপেয়ারের চার্জ (সার্ভিস চার্জ + পার্টসের দাম)
  • রিপেয়ারের অগ্রিম বা অ্যাডভান্স
  • এক্সেসরিজ বিক্রি: চার্জার, কাভার, গ্লাস প্রোটেক্টর, ইয়ারফোন
  • আগের বাকি আদায়

টাকা যায়

  • সাপ্লায়ারের কাছ থেকে পার্টস কেনা
  • দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট
  • স্টাফের বেতন ও দৈনিক খরচ
  • টুলস, সোল্ডারিং পেস্ট, আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো খুচরা জিনিস

এই দুটো তালিকা যদি পরিষ্কার থাকে, তাহলে মাস শেষে বলা যায় আসলে লাভ কত হলো। অনেক দোকানদার শুধু ক্যাশবাক্সের টাকা দেখে লাভ ধরেন, কিন্তু ওই টাকার মধ্যে কাস্টমারের অ্যাডভান্সও আছে, যে ফোন এখনো ডেলিভারিই হয়নি।

প্রতিটা রিপেয়ারকে আলাদা জব হিসেবে লিখুন

হিসাবের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো প্রতিটা ফোন রিসিভ করার সময় একটা জব নম্বর দেওয়া। জব নম্বর ছাড়া "রহিম ভাইয়ের স্যামসাং" লিখে রাখলে দুই সপ্তাহ পরে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, বিশেষ করে যখন একই নামে তিনজন কাস্টমার থাকে।

প্রতিটা জবে অন্তত এগুলো থাকা দরকার:

  1. কাস্টমারের নাম ও মোবাইল নম্বর
  2. ফোনের মডেল ও সমস্যা
  3. আনুমানিক খরচ, যেটা কাস্টমারকে বলা হয়েছে
  4. অ্যাডভান্স কত নেওয়া হয়েছে
  5. কোন পার্টস লেগেছে আর তার কেনা দাম
  6. চূড়ান্ত বিল, ডিসকাউন্ট, কত পেয়েছেন, কত বাকি

জব কার্ড কেন এত জরুরি আর তাতে কী কী রাখবেন, সেটা বিস্তারিত লিখেছি রিপেয়ার জব কার্ড কী, কেন দরকার লেখায়।

উদাহরণ: একটা ডিসপ্লে বদলানোর কাজে পার্টস কিনেছেন ৳১,৮০০ দিয়ে, কাস্টমারের কাছ থেকে নিয়েছেন ৳২,৮০০। এই কাজে আপনার আসল আয় ৳১,০০০, পুরো ৳২,৮০০ না।

পার্টসের কেনা দাম আলাদা রাখুন

সার্ভিসিং ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি নির্ভর করে পার্টসের ওপর। একই মডেলের ডিসপ্লে এই মাসে ৳১,৬০০, পরের মাসে ৳১,৯০০ হয়ে যায়। আপনি যদি পুরনো দামেই কাস্টমারকে বলতে থাকেন, কাজ করেও লাভ কমে যাবে, টেরও পাবেন না।

তাই যা করবেন:

  • সাপ্লায়ারের কাছ থেকে যা কিনবেন, তারিখ, পরিমাণ আর দাম লিখে রাখুন
  • কোন জবে কোন পার্টস লাগল, সেটা জবের সাথে জুড়ে দিন
  • মাসে একবার দেখুন কোন পার্টসের দাম বেড়েছে, সেই অনুযায়ী রেট ঠিক করুন

কোন পার্টস কতটা আছে আর কখন অর্ডার দিতে হবে, সেটা নিয়মিত না দেখলে হয় জরুরি পার্টস ফুরিয়ে যায়, নয়তো অচল পার্টসে টাকা আটকে থাকে।

বাকির হিসাব কখনো মুখে রাখবেন না

"ভাই, কাল দিয়ে যাব" কথাটা প্রতিটা সার্ভিসিং দোকানের পরিচিত। ৳৩০০-৫০০ করে বাকি জমতে জমতে মাস শেষে দেখা যায় ৳১৫,০০০-২০,০০০ টাকা বাইরে পড়ে আছে। আর মুখে রাখা বাকির অর্ধেকই আর ফেরত আসে না, কারণ কেউ মনে রাখে না।

বাকির হিসাবে প্রতিটা এন্ট্রিতে রাখুন:

  • কাস্টমারের নাম ও ফোন নম্বর
  • কোন কাজের বা কোন বিক্রির বাকি
  • মোট বিল, কত দিয়েছে, কত বাকি
  • কবে দেওয়ার কথা বলেছে

সপ্তাহে একদিন, ধরুন শনিবার, বাকির তালিকা দেখে যাদের তারিখ পার হয়ে গেছে তাদের একটা ভদ্র মেসেজ দিন। নমুনা: "আসসালামু আলাইকুম ভাই, আপনার ফোনের রিপেয়ারের ৳৫০০ বাকি আছে। সময় করে দোকানে এলে বা জানালে খুশি হব।"

প্রতিদিন দোকান বন্ধের আগে ১০ মিনিটের রুটিন

হিসাব ঠিক রাখার সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস হলো দিনের হিসাব দিনেই মেলানো। এক সপ্তাহ জমিয়ে রাখলে ভুল খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব।

  1. দিনের শুরুতে ক্যাশবাক্সে কত টাকা ছিল, সেটা লিখুন
  2. আজকে কতগুলো জব ডেলিভারি হলো আর তাতে কত টাকা পেলেন, যোগ করুন
  3. এক্সেসরিজ বিক্রির টাকা যোগ করুন
  4. নতুন অ্যাডভান্স আর পুরনো বাকি আদায় যোগ করুন
  5. আজকের সব খরচ বাদ দিন: পার্টস কেনা, চা-নাস্তা, ডেলিভারি ভাড়া
  6. যা থাকার কথা আর ক্যাশবাক্সে যা আছে, মিলিয়ে দেখুন
  7. মোবাইল ব্যাংকিং-এ আসা টাকা আলাদা করে মিলিয়ে নিন

যদি ৳২০০ কম পাওয়া যায়, সেদিনই খুঁজুন। হয়তো কোনো খরচ লিখতে ভুলে গেছেন, বা কোনো ডেলিভারির টাকা মোবাইল ব্যাংকিং-এ এসেছে। পরের দিন সেটা আর মনে থাকবে না।

খাতা না সফটওয়্যার, কোনটায় রাখবেন

ছোট দোকানে, যেখানে দিনে ৫-৬টা জব আসে আর মালিক নিজেই কাউন্টারে বসেন, ভালোভাবে লেখা খাতাও কাজ চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু খাতার কিছু সমস্যা আছে যেগুলো দোকান বড় হলে চোখে পড়ে:

  • পুরনো কাস্টমারের আগের রিপেয়ার খুঁজতে পাতা উল্টাতে হয়
  • বাকি কত জমেছে, সেটা যোগ করতে আধা ঘণ্টা লাগে
  • স্টাফ কোন এন্ট্রি বদলালো, বোঝার উপায় নেই
  • খাতা ভিজে গেলে বা হারালে সব হিসাব শেষ

এই জায়গায় RepairKhata-র মতো রিপেয়ার শপের সফটওয়্যার কাজে আসে। ফোন রিসিভ করলে নিজেই জব নম্বর তৈরি হয়, কাজে কোন পার্টস লাগল সেটা জবে যোগ করা যায়, আর দাম, ডিসকাউন্ট, পেমেন্ট, বাকি সব এক জায়গায় হিসাব হয়ে থাকে। দিনের আয়, খরচ আর লাভ ড্যাশবোর্ড ও রিপোর্টে দেখা যায়, আলাদা করে যোগ-বিয়োগ করতে হয় না। দুটোর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন খাতা বনাম সফটওয়্যার লেখায়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি টাকা খায়

অনেক দোকান ঘুরে যে ভুলগুলো বারবার দেখা যায়:

  • অ্যাডভান্সকে আয় ধরা: ফোন ডেলিভারি না হওয়া পর্যন্ত অ্যাডভান্স পুরোপুরি আপনার না। কাস্টমার ফোন ফেরত নিয়ে গেলে টাকা ফেরত দিতে হতে পারে।
  • নিজের পকেট আর দোকানের ক্যাশ একসাথে: দুপুরের খাবারের টাকা ক্যাশবাক্স থেকে নিলে সেটাও খরচ হিসেবে লিখুন।
  • ছোট খরচ বাদ দেওয়া: দিনে ৳১৫০ করে ছোট খরচ মাসে ৳৪,৫০০ হয়ে যায়।
  • ওয়ারেন্টির কাজ লিখে না রাখা: ফ্রিতে আবার কাজ করে দিলে পার্টসের খরচ তো হয়ই। সেটা না লিখলে লাভ বেশি দেখাবে।
  • সব হিসাব একজনের মাথায়: মালিক দুদিন না থাকলে কেউ কিছু জানে না।

শুরু করুন আজ থেকেই

হিসাব রাখা একদিনে নিখুঁত হবে না, কিন্তু আজ থেকে শুধু তিনটা জিনিস শুরু করুন: প্রতিটা ফোনে জব নম্বর, প্রতিটা বাকি লিখে রাখা, আর রাতে ১০ মিনিটে ক্যাশ মেলানো। এক মাস পরে দেখবেন দোকানের আসল চেহারা অনেক পরিষ্কার।

সফটওয়্যারে এগুলো কেমন দেখায়, সেটা দেখতে কোনো অ্যাকাউন্ট ছাড়াই RepairKhata-র লাইভ ডেমো ঘুরে দেখুন। ভালো লাগলে ৭ দিনের ফ্রি ট্রায়ালে নিজের দোকান খুলুন, আর ফোন রিসিভ করার সময় কী কী দেখে নেবেন, সেটা জানতে পড়ুন ফোন রিসিভ করার চেকলিস্ট।

সব লেখা