এক্সেসরিজ বিক্রি ও POS: রিপেয়ার শপে বাড়তি আয়ের সহজ উপায়

৭ মিনিটে পড়ুন

চার্জার, কভার, গ্লাস বিক্রি করে রিপেয়ার শপের আয় বাড়ান সহজেই। কোন এক্সেসরিজ রাখবেন, দাম কত, আর POS দিয়ে বিক্রি ও স্টকের হিসাব কীভাবে রাখবেন জানুন।

রিপেয়ার শপের আয় সাধারণত ওঠানামা করে। কোনো দিন দশটা ডিসপ্লে বদলানোর কাজ আসে, কোনো দিন সারা বিকেল বসে থাকতে হয়। অথচ যে কাস্টমার ফোন ঠিক করাতে এসেছেন, তার হয়তো একটা নতুন গ্লাস প্রোটেক্টর, একটা কভার বা একটা ভালো চার্জার দরকার। এই ছোট ছোট বিক্রিই মাস শেষে একটা ভালো অঙ্কের বাড়তি আয় হয়ে দাঁড়ায়।

সমস্যা হলো, এক্সেসরিজ বিক্রির হিসাব অনেক দোকানেই সবচেয়ে এলোমেলো থাকে। ১৫০ টাকার একটা কেবল বিক্রি হলো, টাকা ড্রয়ারে গেল, কিন্তু খাতায় উঠল না। মাস শেষে বোঝা যায় না আসলে কত বিক্রি হলো, কোন মাল শেষ, কোনটায় লাভ। এই লেখায় দেখাব কীভাবে এক্সেসরিজ বিক্রিকে গুছিয়ে একটা নিয়মিত আয়ের উৎস বানাবেন।

কেন রিপেয়ার শপে এক্সেসরিজ রাখা লাভজনক

রিপেয়ার শপে যারা আসেন, তারা ইতিমধ্যেই আপনাকে বিশ্বাস করে ফোন হাতে দিয়েছেন। তাই আপনার সাজেশন তারা অন্য দোকানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। এর কয়েকটা সুবিধা:

  • নতুন কাস্টমার খুঁজতে হয় না, যিনি এসেছেন তার কাছেই বিক্রি
  • ডিসপ্লে বদলানোর পর নতুন গ্লাস প্রোটেক্টর আর কভার স্বাভাবিকভাবেই দরকার হয়
  • চার্জিং পোর্টের সমস্যা নিয়ে এলে অনেক সময় দোষটা আসলে নষ্ট কেবল বা চার্জারের
  • রিপেয়ারের কাজ কম থাকলেও এক্সেসরিজ বিক্রি দোকানের খরচ চালাতে সাহায্য করে

ধরুন দিনে গড়ে ১০টা এক্সেসরিজ বিক্রি হলো, প্রতিটায় গড়ে ৮০ টাকা লাভ। দিনে ৮০০ টাকা, মাসে ২৬ দিন খোলা থাকলে প্রায় ২০,৮০০ টাকা। এটা অনেক ছোট দোকানের এক মাসের ভাড়ার চেয়ে বেশি।

কোন এক্সেসরিজ রাখবেন

সব কিছু একসঙ্গে তুলে আনবেন না। যা দ্রুত বিক্রি হয়, তা দিয়ে শুরু করুন:

  1. গ্লাস প্রোটেক্টর ও টেম্পার্ড গ্লাস: সবচেয়ে বেশি বিক্রি, লাগিয়ে দেওয়ার সার্ভিসও চার্জ করা যায়।
  2. ব্যাক কভার ও কেস: জনপ্রিয় মডেলগুলোর জন্য কয়েকটা ডিজাইন রাখুন।
  3. চার্জিং কেবল: Type-C, Lightning আর Micro USB, তিন ধরনেরই রাখুন।
  4. চার্জার ও অ্যাডাপ্টার: সাধারণ আর ফাস্ট চার্জার দুই ধরনের।
  5. ইয়ারফোন ও ছোট ব্লুটুথ ডিভাইস: চাহিদা বুঝে অল্প পরিমাণে।
  6. মেমোরি কার্ড, OTG, পাওয়ার ব্যাংক: এলাকার কাস্টমার বুঝে।

শুরুতে প্রতিটা আইটেম অল্প করে আনুন। দুই সপ্তাহ পর দেখুন কোনটা বেশি চলছে, তারপর শুধু সেগুলোই বেশি করে আনুন।

নকল বা নিম্নমানের চার্জার বিক্রি করবেন না। সস্তা চার্জারে ফোনের ব্যাটারি বা বোর্ড নষ্ট হলে কাস্টমার আপনাকেই দোষ দেবেন, আর রিপেয়ার শপ হিসেবে আপনার সুনামই সবচেয়ে বড় পুঁজি।

দাম কীভাবে ঠিক করবেন

এক্সেসরিজে লাভের হার পার্টসের চেয়ে সাধারণত বেশি রাখা যায়, তবে পাশের দোকানের দামের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একটা উদাহরণ দেখুন:

  • টেম্পার্ড গ্লাস কেনা ৪০ টাকা, বিক্রি ১৫০ টাকা লাগিয়ে দেওয়াসহ
  • ব্যাক কভার কেনা ৯০ টাকা, বিক্রি ২০০-২৫০ টাকা
  • Type-C কেবল কেনা ৮০ টাকা, বিক্রি ১৫০-১৮০ টাকা
  • ২০W চার্জার কেনা ৩৫০ টাকা, বিক্রি ৫৫০-৬৫০ টাকা

এখানে অঙ্কগুলো উদাহরণ মাত্র, আপনার সাপ্লায়ার আর এলাকা অনুযায়ী বদলাবে। জরুরি হলো প্রতিটা আইটেমের কেনা দাম লিখে রাখা। কেনা দাম না জানলে বিক্রির দিন বোঝা যায় না আসলে কত লাভ হলো, আর ডিসকাউন্ট দিতে গিয়ে অজান্তে লসে বিক্রি হয়ে যায়। রিপেয়ারের দাম ঠিক করার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন রিপেয়ারের দাম কীভাবে ঠিক করবেন লেখায়।

কাউন্টারে বিক্রি বাড়ানোর কৌশল

বিক্রি বাড়াতে চাপ দেওয়ার দরকার নেই, দরকার সঠিক সময়ে সঠিক প্রস্তাব।

  • ডেলিভারির সময় অফার করুন: "ভাই, নতুন ডিসপ্লে লাগানো হলো, একটা ভালো গ্লাস লাগিয়ে দিই? ১৫০ টাকা, পড়ে গেলে ডিসপ্লে বাঁচবে।"
  • সমস্যার সঙ্গে মিলিয়ে বলুন: চার্জিং সমস্যা নিয়ে এলে কেবলটা টেস্ট করে দেখান, নষ্ট হলে নতুনটা দেখান।
  • কাউন্টারের সামনে সাজিয়ে রাখুন: কাস্টমার যেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, সেখানে চোখে পড়ার মতো করে।
  • ছোট কম্বো বানান: কভার আর গ্লাস একসঙ্গে নিলে ৩০-৫০ টাকা কম।

একটা নিয়ম মানবেন: কাস্টমার না বললে জোর করবেন না। একবার প্রস্তাব দিন, তারপর তার সিদ্ধান্ত।

POS দিয়ে বিক্রির হিসাব রাখুন

POS মানে Point of Sale, অর্থাৎ যেখানে বিক্রিটা হয় সেখানেই হিসাব রাখার ব্যবস্থা। এর জন্য দামি মেশিন লাগবেই এমন না; ফোন বা কম্পিউটারের ব্রাউজারে চলা একটা সফটওয়্যারই যথেষ্ট।

ভালো POS ব্যবস্থায় যা থাকা দরকার:

  • আইটেম বেছে নিলেই দাম চলে আসা, হাতে হিসাব করতে না হওয়া
  • বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে স্টক থেকে কমে যাওয়া
  • কাস্টমারকে ইনভয়েস দেওয়া, প্রিন্ট বা ফোনে শেয়ার করে
  • নগদ, মোবাইল ব্যাংকিং বা বাকি, কীভাবে টাকা এলো তা রেকর্ড করা
  • দিন শেষে মোট বিক্রি আর লাভ এক নজরে দেখা

RepairKhata-তে রিপেয়ারের পাশাপাশি এক্সেসরিজ বিক্রির জন্য আলাদা সেলস/POS অংশ আছে। প্রোডাক্টের কেনা দাম আর স্টক রাখা যায়, বিক্রি করলে ইনভয়েস প্রিন্ট, PDF বা শেয়ার করা যায়, আর বাকি থাকলে সেটাও হিসাবে থাকে। দিনের আয়, খরচ আর লাভ রিপোর্টে একসঙ্গে দেখা যায়, তাই রিপেয়ার আর এক্সেসরিজ মিলিয়ে দোকান আসলে কত আয় করল তা আলাদা করে যোগ করতে হয় না।

স্টক শেষ হওয়ার আগেই জানুন

এক্সেসরিজ ব্যবসার সবচেয়ে বড় লস হয় দুইভাবে: যা চলে তা শেষ হয়ে থাকা, আর যা চলে না তা মাসের পর মাস তাকে পড়ে থাকা।

  1. প্রতিটা আইটেমের একটা ন্যূনতম সংখ্যা ঠিক করুন, যেমন Type-C কেবল ১০টার নিচে নামলে অর্ডার।
  2. সপ্তাহে একদিন লো স্টক তালিকা দেখে সাপ্লায়ারকে অর্ডার দিন।
  3. সাপ্লায়ার থেকে কেনার সময় কেনাকাটার হিসাব রাখুন, যাতে কোন সাপ্লায়ার কত দামে দিল পরে মিলিয়ে দেখা যায়।
  4. তিন মাসে একটাও বিক্রি না হওয়া আইটেম ছাড়ে বিক্রি করে টাকা ঘুরিয়ে নিন।

RepairKhata-তে লো স্টক দেখা যায় আর সাপ্লায়ার থেকে কেনাকাটার রেকর্ড রাখা যায়। স্টক ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বিস্তারিত গাইড আছে মোবাইল পার্টসের স্টক ম্যানেজমেন্ট লেখায়।

বিক্রির টাকা যেন ড্রয়ারে হারিয়ে না যায়

ছোট বিক্রিগুলোই সবচেয়ে বেশি হিসাবের বাইরে থেকে যায়। এর সমাধান খুব সাধারণ: প্রতিটা বিক্রি, যত ছোটই হোক, সিস্টেমে তুলতে হবে। কাউন্টারে যে স্টাফ বসেন, তাকে এটা পরিষ্কার করে বলে দিন। দিন শেষে সিস্টেমের মোট বিক্রি আর ড্রয়ারের টাকা মিলিয়ে দেখুন। প্রথম কয়েক সপ্তাহ একটু কষ্ট লাগবে, তারপর অভ্যাস হয়ে যাবে।

দৈনিক হিসাব মেলানোর পুরো পদ্ধতি পাবেন দোকানের দৈনিক লাভ-ক্ষতির হিসাব লেখায়।

শেষ কথা

এক্সেসরিজ বিক্রি রিপেয়ার শপের জন্য সবচেয়ে সহজ বাড়তি আয়ের পথ, যদি হিসাবটা পরিষ্কার থাকে। অল্প দিয়ে শুরু করুন, কেনা দাম লিখে রাখুন, প্রতিটা বিক্রি তুলে রাখুন।

রিপেয়ার আর বিক্রি একসঙ্গে কীভাবে চলে, অ্যাকাউন্ট না খুলেই লাইভ ডেমোতে দেখে নিন। পছন্দ হলে ৭ দিনের ফ্রি ট্রায়ালে দোকান খুলুন।

সব লেখা